পৃথিবী ও মানুষের কল্যাণে ভিডিও গেমস এর অবদান!

পৃথিবী ও মানুষের কল্যাণে ভিডিও গেমস এর অবদান, Playing For The Planet, Video games to save the earth

বিশ্বজুড়ে প্রায় ২.৬ বিলিয়ন এর থেকে বেশী মানুষ ভিডিও গেম খেলে থাকেন। ক্রমবর্ধমান এই ভিডিও গেম খেলোয়াড়দের বিরাট একটা অংশই পরিবেশকে বাঁচানো এবং এর সংরক্ষণে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচীর (ইউএনইপি) 'প্লেয়িং ফর প্ল্যানেট' শিরোনামে গত বছর (২০১৯) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যে ভিডিও গেমস সামাজিক এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে কয়েক বিলিয়ন মানুষকে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে!


ভিডিও গেমের এর যাত্রা!

আমেরিকান গেম ডেভেলোপার রালফ এইচ. বেয়ারকে ভিডিও গেমের জনক বলা হয়ে থাকে। ১৯৭২ সালে রালফের পরিকল্পনায় পৃথিবীর সর্বপ্রথম সহজলভ্য গেমিং কন্সোল ‘অডিসি’-এর সূচনা হয়। ভিডিও গেমের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত এই আউটপুট ডিভাইসটি মানুষকে প্রথমবারের মতো টিভিতে গেম খেলার সুযোগ করে দেয়। 


এরপর দিন যত পেরিয়েছে প্রযুক্তি আর নিত্যনতুন ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ভিডিও গেম পরিণত হয়েছে সফল এক অর্থনৈতিক শিল্পে।


ভিডিও গেমের বাজার কত বড়?

ভিডিও গেম শিল্প থেকে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসে। জানলে হয়তো অবাক হবেন,  এই অর্থের পরিমাণ হলিউড, বলিউড এবং রেকর্ডকৃত বিক্রিত গানের সমন্বিত আয়ের সমান। শুধু যে ভিডিও গেম যারা খেলেন তাদের থেকেই এই বিশাল আয় হচ্ছে তা নয়, বিভিন্ন মাধ্যমে যারা ভিডিও গেমের ধারণকৃত ভিডিও দেখেন তারাও এই আয়ের এক বড় অংশীদার। বর্তমানে এর একটি বড় অংশ হচ্ছে ইউটিউব গেমিং এবং টুইচ টিভি!


২০১৭ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালেই শুধু ৬৬৬ মিলিয়ন মানুষ ইউটিউবে এবং টুইচে অন্যদের ভিডিও গেম খেলার ভিডিও দেখেছে যা কি না ইএসপিএন, এইচবিও এবং নেটফ্লিক্সের সমন্বিত দর্শক সংখ্যা থেকেও বেশি! বিশ্বে প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিন বিলিয়ন মানুষ নিয়মিত ভিডিও গেম খেলেন, বছর শেষে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫৬ বিলিয়নে!


মানবিক সাহায্যে ভিডিও গেমস!

২০১৯-২০ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলের ঘটনায় প্রায় ১৮ মিলিয়ন হেক্টর জমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মানুষ, জীববৈচিত্র্য কিংবা গাছপালা কোন কিছুই রক্ষা পায়নি সেই দাবানলের ভয়াবহতা থেকে।


ডিসেম্বরে দাবানল শুরুর পর 'স্পেস এপ' ভিডিও গেমসের খেলোয়াড়েরা গেমিং কোম্পানীটির কাছে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে লন্ডনভিত্তিক ফার্মটি গেমসের বিভিন্ন টাইটেলে অর্থ নির্ধারণ করে দেয়। এই উদ্যোগ গ্রহন করার মাত্র চারদিনের মাথায় গেমারদের কাছ থেকে সাহায্য স্বরূপ উঠে আসে ১ লক্ষ ২০ হাজার ডলার!


স্পেস এপ গেমসের সাবেক কন্টেন্ট প্রধান ডেবোরাহ মেনশাহ-বনসু বলছেন, "মানুষের এত সাড়া দেখে বোঝা যায়  ভালো কাজের উদ্যোগগুলোয় নিজেদের যুক্ত রাখার ব্যাপারে তারা কতটা আগ্রহী।" 


প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা মানবিক সংকটে ভিডিও গেমস খেলোয়াড়দের আর্থিক সাহায্য প্রদানের ব্যাপারটি অবশ্য এবারই প্রথম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভিডিও গেম ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ড ওয়ার্কসের তৈরিকৃত শিশুদের জনপ্রিয় ভিডিও গেম এনিমেল জ্যাম (Animal Jam)। এই গেমের প্রায় ১০০ মিলিয়নের অধিক নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে যাদের প্রায় ২২ শতাংশই ল্যাটিন আমেরিকা এবং ফিলিপাইনের। এরা ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থ দান করেছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং শিক্ষাখাতের উন্নয়নে। শুধু যে অর্থ সহায়তা তা নয়, ভিডিও গেমসের মাধ্যমে খুব কম সময়ের ব্যবধানে জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আর ভিডিও গেমস সবচেয়ে বেশি খেলে থাকে তরুণ-রাই। ইউএনইপি- এর এক প্রতিবেদন বলছে, ২১-৩৫ বছর বয়সী তরুণদেরই ভিডিও গেমসে ঝোঁক বেশি থাকে। তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলার মাধ্যম হিসেবে যদি ভিডিও গেমসকে কাজে লাগানো যায় তবে ইতিবাচক বৈশ্বিক পরিবর্তন জটিল কোনো ব্যাপার হবে না বলেই ধারণা জাতিসংঘের।


এই গ্রহের জন্য খেলা!

বিশ্বের বৃহত্তম ২৫টি গেম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির সাথে মিলে জাতিসংঘ একটি জোট গঠন করেছে। উদ্দেশ্য  এই জোটের তৈরিকৃত ভিডিও গেমগুলোর প্রায় ৯৭০ মিলিয়ন খেলোয়াড়দের জলবায়ু সংকট সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। 'প্লেয়িং ফর দ্য প্লানেট' নামের এই জোটে মাইক্রোসফট, পিক্সেলভেরী স্টুডিও, ইউবিসফট, স্পেস এপসহ খ্যাতনামা গেমিং কোম্পানিগুলো যুক্ত হয়েছে। জোটের সদস্যরা গেমগুলোতে সবুজ পরিবেশ সংযুক্তকরণ, তাদের নির্গমন হ্রাসে উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত ইস্যুগুলোয় সমর্থন করেছে। একই সাথে লক্ষ লক্ষ গাছ লাগানো থেকে শুরু করে তাদের পণ্যগুলোতে প্লাস্টিক হ্রাস করার উদ্যোগ নিতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছ কোম্পানিগুলো।


উদাহরুস্বরূপ পিক্সেলভেরীর কথাই বলা যাক। তাদের 'চয়েজেস (Choices)' গেমটি এক তরুণীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে, যে তার উপকূলীয় গ্রাম ছেড়ে এসেছে যেখানে প্রচুর মাছ মারা যাচ্ছিল। তার ছোট বোন নিশ্চিত যে মাছ মারা যাওয়ার এই ভয়াবহতার সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের সংযোগ রয়েছে। চয়েজেসে খেলোয়াড়েরা সেই তরুণীর ছোট বোনকে সাহায্য করতে চেষ্টা করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা চালায়।


সারান ওয়াকার নামে পিক্সেলভেরীর লেখক প্যানেলের এক সদস্য বলছিলেন, "আমরা সকলেই গ্রেটা থানবার্গের আন্দোলন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমরা মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে এককভাবে আমরা যার যার জায়গা থেকেই পরিবেশ বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু করতে পারি।"


পরিবেশ বাঁচানোর সচেতনতায় ভিডিও গেম শিল্প!

এই বছরের আগস্টে ভিডিও গেমসের বেশ বড় কয়েকটি কোম্পানি তাদের তৈরিকৃত জনপ্রিয় গেমসগুলোয় পরিবেশ বিষয়ক মিশন এবং পরিবেশ সচেতন বিষয়ক বার্তা যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই তালিকায় আছে অ্যাংরি বার্ডস ২, গলফ ক্ল্যাশ, সাবওয়ে সারফেসের মতো জনপ্রিয় গেমগুলো। কোম্পানিগুলো আশা করছে, নতুন এই সংযোজন খেলোয়াড়দের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করা, এবং বিপন্নপ্রায় প্রাণী, যেমন- নেকড়েদের রক্ষার উদ্যোগে শামিল করতে সহায়তা করবে। 


ইউএনইপি-এর এডুকেশন ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান সেম ব্যারেট বলছেন, এই গ্রহের অন্যতম বৃহৎ যোগাযোগের মাধ্যম এখন ভিডিও গেমিং। তার মতে, "গেমারদের পরিবেশগত কর্মসূচিগুলোর প্রতি সচেতনতা বাড়াতে, এবং একইসাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় শিক্ষিত, অনুপ্রাণিত এবং সক্রিয় করতে উৎসাহিত করার জন্য আমরা এই শিল্পকে সমর্থন করার লক্ষ্য নিয়েছি এবং এখনও পর্যন্ত এটি কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।"


এসডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখবে ভিডিও গেমস?

২০১২ সালের জুনে ব্রাজিলে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) গ্রহণ করা হয়। ২০১৬ সাল থেকে পরের ১৫ বছর এই এসডিজির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে। দারিদ্র্যহীনতা, ক্ষুধা থেকে মুক্তি, সুস্বাস্থ্য, সুপেয় পানি, জলবায়ু বিষয়ক পদক্ষেপসহ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এসডিজিতে। ইউএনইপি-এর প্রতিবেদনে ২১৪টি গেমসের কথা বলা হয়েছে যেগুলো প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসিডিজির এক বা একাধিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করছে।


জাতিসংঘ গেমিং কোম্পানিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি সুপারিশমালা তৈরি করেছে, যেগুলো এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনেক সহায়ক হতে পারে। এই সুপারিশগুলোর প্রয়োগও শুরু করেছে গেমিং কোম্পানীগুলো।

 

জাতিসংঘ বলছে, একজন খেলোয়াড় যখন গেমে থাকা বস্তুগুলোয় আকৃষ্ট হয়ে খেলায় বুঁদ থাকে, তখন তাকে পরিবেশ বা সবুজায়ন বিষয়ক বেশ কিছু জ্ঞান বা উপদেশও দেয়া যেতে পারে। এটা হতে পারে কন্সোল ডিফল্টগুলো সুইচ অফ করা বা পুনরায় সেট করা যাতে তারা এভাবে কম শক্তি খরচের মাধ্যমে (পয়েন্টের বিনিময়ে) জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারার শিক্ষা নিতে পারে। কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য গেমে একটি ব্যাজ পুরস্কার হিসেবে রাখা যেতে পারে। এভাবে পরিবেশ এবং প্রকৃতি বাঁচাতে মানুষকে সচেতন করতে পারার এক চমৎকার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে ভিডিও গেম।

1 Comments

Post a Comment

Post a Comment

Previous Post Next Post